প্রাথমিকে শিক্ষক সংকট, শিক্ষার সংকট

সম্পাদকীয়

 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা হচ্ছে প্রতিটি শিশুর জন্য সবচেয়ে অগ্রগণ্য মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করাই শুধু একটি দেশের অপরিহার্য দায়িত্ব নয়; এর পরের দায়িত্বটি পড়ে পরিবার বা বাবা-মায়ের ওপর। ভুললে চলবে না, প্রাথমিক শিক্ষাই কার্যত একটি দেশের গণমানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে, তাদের সামনে খুলে দেয় সুযোগের দুয়ার এবং একই সাথে পথ করে দেয় আত্মোন্নয়নের পথ।

এর মাধ্যমেই একটি জাতি খুঁজে পায় দারিদ্র্য নাশের উপায়। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে টেকসই উন্নয়নের একটি পরম পূর্বশর্ত। তাই একটি জাতির দায়িত্ব হচ্ছে- প্রতিটি শিশুকে সে বালক কিংবা বালিকা হোক, সবার আগে তার জন্য ভালো মানের প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা। চারপাশের দুনিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হলে শিশুদের আকৃষ্ট করতে হবে প্রাথমিক জীবনের শিক্ষার প্রতি। এটি হচ্ছে পরবর্তী শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। এই ভিত্তি নড়বড়ে হলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সত্যটুকু আমরা বুঝতে চাই না, উপলব্ধি করতে চাই না। তেমনি প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বটুকুও আমাদের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার বাইরেই থেকে যায়। ফলে মাঝে মধ্যেই আমাদের কাছে আসে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাসংক্রান্ত নানা অশুভ সংবাদ, যা আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সম্প্রতি একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকের খবরে জানা যায়- দেশের ৬০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। খবর মতে, প্রতি ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছয়টিই চলছে প্রয়োজনের চেয়ে কমসংখ্যক শিক্ষক নিয়ে। দেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা আট হাজার ৫০০। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোকেই সবচেয়ে কমসংখ্যক শিক্ষক নিয়ে চলতে হচ্ছে। এসব স্কুলের প্রতিটিতে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়েই শিক্ষাক্রম চালাতে হচ্ছে। শিক্ষকের অভাবে এসব স্কুলের প্রতিদিনের শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান বেসরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর চেয়ে নিচে নেমে পড়ার প্রধানতম কারণ এটি। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা এমনটিই মনে করেন।

২০১৭ সালের ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন অ্যানুয়েল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট’-এ দেখানো হয়েছে আট হাজার ৫৬৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছে শিক্ষকের চরম অভাব। এসব স্কুলের মধ্যে সাতটি বিদ্যালয় চলছে মাত্র একজন করে শিক্ষক নিয়ে, ৭২১টি স্কুল চলছে মাত্র দু’জন করে শিক্ষক দিয়ে আর সাত হাজার ৭৬৪টি বিদ্যালয়ে রয়েছে তিনজন করে শিক্ষক। এই রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে কোনো মতে কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে কমপক্ষে চারজন ‘ওয়ার্কিং টিচার’ থাকা প্রয়োজন। তা না হলে মানসম্পন্ন শিক্ষাদান কিছুতেই সম্ভব নয়।

এ ধরনের শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দেশের প্রাথমিক স্কুলগুলো যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে, তা কিন্তু সরকারি মহল স্বীকার করতে নারাজ। তাদের মুখে শুধু উন্নয়নের জারিজুরি। তাদের মুখে উন্নয়নের জারিজুরি শুনলে মনে হয়, তারা দেশটিকে এরই মধ্যে উন্নয়নের স্বর্গে পরিণত করেছেন। তাদের অবস্থা যেন এমন, এখন কোথায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাবেন সেসব জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। কিন্তু দেশের ভিত্তিমূলের প্রাথমিক শিক্ষা যে ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, তা দেখার অবকাশ তাদের নেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *