সুরা তালাক্বের আয়াতের ব্যাখ্যা

ধর্ম দর্শন

সুরা তালাক পবিত্র কুরআনের ৬৫ তম সুরা। ১২ আয়াতের এ সুরা পবিত্র মদিনায় নাজিল হয়েছিল। এ সুরার প্রথম সাতটি আয়াত তালাক ও এর বিধি-বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাপীদের শাস্তি ও সৎকর্মশীলদের পুরস্কার তথা সুপথ আর বেহেশতের নানা নেয়ামত সম্পর্কেও আলোচনা রয়েছে এ সুরায়। সুপথ বা হেদায়াত করার ক্ষেত্রে মহানবীর ভূমিকা এবং মহান আল্লাহর জ্ঞান ও শক্তি নিয়েও বক্তব্য রয়েছে সুরা তালাকে।

সুরা তালাকের প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: হে নবী, তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করো। তাদেরকে তাদের ঘর থেকে তাড়িয়ে দিও না এবং তারাও যেন বের না হয় যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে জড়ায়। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমালংঘন করে,সে নিজেরই ক্ষতি করে। সে জানে না,হয়তো আল্লাহ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন

  • এখানে মুসলিম সমাজের নেতা হিসেবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে সম্বোধন করা হলেও সব মুসলমানকে তালাকের বিধান জানিয়ে দেয়া এ আয়াতের উদ্দেশ্য।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ দাম্পত্য জীবনের শর্ত। পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখা ও মজবুত করার জন্য এ বিষয়টি একান্তই জরুরি। কিন্তু এই শর্তটির অভাবসহ নানা কারণে দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রাখা কখনও কখনও অসম্ভব বা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি দেখা দেয় যে বিয়ের সম্পর্ক জোর করে টিকিয়ে রাখার ফলে উভয় পক্ষের জন্যই নানা কঠিন সমস্যা দেখা দেয়। আর অনিবার্য সেইসব দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য ইসলাম তালাকের ব্যবস্থাও রেখেছে যদিও এ ধর্ম অসম্ভব কঠিন না হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বজায় রাখতে বলে এবং তালাকের পথ বেছে না নেয়ার ওপরই জোর দেয়। অন্য কথায় ইসলাম তালাককে অনিবার্য ও বিশেষ ব্যতিক্রমী অবস্থা ছাড়াকখনও উৎসাহ দেয় না, বরং তালাকের সিদ্ধান্তকে তীব্র তিরস্কার করে থাকে।

ইসলামী বর্ণনা মতে তালাক সবচেয়ে অপছন্দনীয় বৈধ কাজ।  মহানবী (সা) বলেছেন, এমন যে কোনো পদক্ষেপ যার পরিণতিতে তালাক বা স্বামী-স্ত্রীর স্থায়ী বিচ্ছিন্নতা ঘটে ও এর ফলে ইসলামের একটি পরিবার যদি ধ্বংস হয়ে যায় মহান আল্লাহর কাছে তার চেয়ে বেশি ঘৃণ্য আর কিছুই নেই। ইমাম জাফর সাদিক  (আ) ও বলেছেন, বৈধ বিষয়গুলোর মধ্যে তালাকের চেয়ে ঘৃণ্য বা অপছন্দনীয় কিছু নেই মহান আল্লাহর কাছে।

তালাকের বিরুদ্ধে ইসলামের খুব কঠোর অবস্থানের কারণ হল তা স্বামী-স্ত্রী এবং তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ করে বিচ্ছিন্ন পরিবারের সন্তানদের অনুভূতির জন্য খুবই ক্ষতিকারক ও অসম্মানজনক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ যাতে তালাক পর্যন্ত না গড়ায় সে লক্ষ্যেই পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, দম্পতির মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে উভয় পক্ষের আত্মীয়দের উচিত পারিবারিক আদালত গঠনের মাধ্যমে তাদেরকে শুধরে দেয়া এবং তালাকের পরিবেশকে প্রতিরোধের চেষ্টা করা।

কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতভেদ নিরসনের সব ধরনের প্রচেষ্টা ও বনি-বনা করে দেয়ার সব উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তালাক অনিবার্য হয়ে যায়। আর এ অবস্থায় কিছু কিছু নিয়ম মেনে তালাকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে সুরা তালাকে যাতে তালাকের নেতিবাচক প্রভাবগুলো কমে যায়। যেমন, কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করে নতুন করে বিয়ের উদ্যোগ না নেয়া তথা ইদ্দত মেনে চলা। ফলে স্ত্রী যদি গর্ভ-ধারণ করে থাকেন তাহলে তারা আবারও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফিরে যেতে পারবেন। ইসলামী বিধানে ইদ্দত পালনের সময় স্ত্রীকে স্বামীর ঘরেই থাকতে বলা হয় এবং এ সময় তার সঙ্গে যথাযথ তথা সদাচারণ করতে বলা হয়। ফলে এ সময় স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে আবারও যোগাযোগের সুযোগ পান এবং তারা সাময়িক উত্তেজনার আওতামুক্ত থেকে তালাকের পরিণতি সম্পর্কে ধীর-স্থিরভাবে চিন্তা-ভাবনারও সুযোগ পান। পর্যায়-ক্রমিক তালাকের এই প্রক্রিয়া স্বামী ও স্ত্রীকে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার এবং আপোষ-রফার ব্যাপক সুযোগ দেয়।

এ ছাড়াও ইদ্দত পালনের কারণে স্ত্রী গর্ভবতী কিনা তা স্পষ্ট হয় এবং এর ফলে পরিবারের সন্তানের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়। প্রত্যাবর্তনযোগ্য তালাকে স্বামী ইচ্ছে করলে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতে পারেন এবং অতীতের মতই দাম্পত্য জীবন শুরু করতে পারেন। কিন্তু ইদ্দতের সময় পার হওয়ার পরও যদি স্বামী-স্ত্রী আপোষ না করেন তখন তাদের জন্য তালাক তথা বিচ্ছিন্নতাই কল্যাণকর। কারণ তারা পরস্পর আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে চান না। সুরা তালাকের দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

এরপর তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছে, তখন তাদেরকে যথোপযুক্ত পন্থায় রেখে দেবে অথবা সম্মানজনক পন্থায় ছেড়ে দেবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোককে সাক্ষী রাখবে। তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দিবে। এতদ্দ্বারা যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর যে আল্লাহকে ভয় করে,আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন।

এ আয়াতে দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি উল্লেখ করে বলা হয়েছে হয় যথাযোগ্য মর্যাদায় দাম্পত্য জীবন অব্যাহত রাখতে হবে অথবা সম্মানজনকভাবে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আন্তরিকতা ও মানবীয় সম্পর্কের ভিত্তিগুলোর কোনো চিহ্ন বা লেশমাত্র না থাকে তাহলে পরস্পরের অধিকার লংঘন করা ছাড়াই সমঝোতার মধ্য দিয়ে এবং কোনো হৈ-চৈ বা সংঘাত না বাধিয়ে তাদের আলাদা হয়ে যাওয়াই উচিত। তালাক বা স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার জন্য দুজন ন্যায়পরায়ন পুরুষকে সাক্ষী করতে হয় যাতে দম্পতির পরস্পরের অধিকার ক্ষুন্ন না হয় কিংবা ভবিষ্যতে কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে কোনো পক্ষই যেন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে না পারে। এ ধরনের সাক্ষী রাখার অন্য উদ্দেশ্যটি হল তারা যেন প্রাথমিক পর্যায়ে বিচ্ছিন্নতাকামী স্বামী-স্ত্রীকে আপোষ-রফায় উৎসাহ যোগান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *