দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে সরকার হাতে নিয়েছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রায় ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িতব্য এই প্রকল্পের পুরো অর্থায়ন করা হবে সরকারি তহবিল থেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। এই সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।
প্রকল্পের আওতায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফ-টেক এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রথম ধাপে ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজ করা হবে।
এ ছাড়া গড়াই অফ-টেকে ১৫টি স্পিলওয়ে, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক এবং ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে চন্দনা অফ-টেকে চারটি ও হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিসনা অফ-টেক গঙ্গা নদীব্যবস্থা থেকে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার, পলি জমা কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পটি কৃষি ও মৎস্য খাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং প্রায় দুই লাখ ৩৪ হাজার টন মাছের উৎপাদন বাড়তে পারে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বড় ভূমিকা রাখবে এই প্রকল্প।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হবে। এতে চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলা উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম ধাপ বাস্তবায়িত হলে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি সুবিধা পাবে।
উপকারভোগী জেলার মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পিরোজপুর।
দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।
উল্লেখ্য, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন বিএনপি সরকার প্রথম এ উদ্যোগ নেয়। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে সমীক্ষার কাজ শেষ করে।



